Print

ট্রেডেল মেশিনে ছাপা

(১৯৮৭-তে ঢাকায় প্রথম জাতীয় কবিতা
উৎসব আয়োজনের স্মৃতিপাত্রদের প্রতি)

এখনও ফুঁসছে সেই
ট্রেডেল মেশিনে ছাপা লাল লিফলেট।

কবিতাকে সামরিক পোশাকীকরণ আর
প্রাসাদীকরণের প্রামাণ্য প্রতিবাদে
আমরা একটি কাব্য-কারুকলা-কেন্দ্রে
সপেছিলাম বিপ্লব।
কবিতাকর্মকে
শৃঙ্খল মুক্তির স্বাদ দিতে
জঁপেছি তারুণ্য, সাহসের বলিহারী।
আমাদের কণ্ঠে নিরপেক্ষতার আকুলতা,
শ্লোগানে শ্লোগানে গণতন্ত্র,
বাঁশ-খুঁটি-ত্রিপল-হাতুড়ি-গাইতি উঁচিয়ে
আমরাই বানালাম সাজালাম কবিতার মঞ্চ
পথহারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রথম প্রমত্ত পটভূমি।


পুলিশের রক্তচক্ষু, সামরিক বুট, বাটন-পিটন,
বেগানা বুলেট, সাঁজোয়া বাহিনী, হাতকড়া,
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প
        সকল আতংকের উর্ধে উঠে
আমরা তুলেছি সেইদিন কবিতার রোদেলা পতাকা,
    বুকে বুকে সূর্যের বিকাশ
        মুক্তকণ্ঠের উন্মত্ত জয়ধ্বনি।
আমাদের সঙ্গে কবিতার রক্ত-রং ঘুড়ি ওড়াতে এলেন
প্রমত্ত রাজনীতিক, প্রজ্ঞাবান চিকিৎসক-প্রকৌশলী-
কৃষিবিদ-ঠিকাদার-শিল্পী-সাংবাদিক-শিক্ষক-লেখকসহ
আম পেশাদার, মায় তিন চাকার রিকশাচালক, সমঝদার।


ট্রেডেল মেশিনে ছাপা আমাদের লাল লিফলেট,
সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট নিষিদ্ধ পোস্টার
কতোগুলো চেষ্টা কবির বিরুদ্ধে
তেষ্টা কবিদের নিষ্ঠার লড়াই,
কি দারুণ ছিলো তার ইশ্তেহার, প্রত্যাশা,
                   প্রস্তাবনা।  

হাত ধরাধরি করে আসবে সখা-সখীর গণতন্ত্র।
নদীমাতৃক একটি দেশ কবিমাতৃকতায় হাসবে,
কবিতার সাজানো বাগান হবে মোহের শহরতলী,
পল্লীশ্রী আবার ফিরে পাবে
    প্রকৃতি প্রধান সৌন্দর্যের নিটোল উপমা, উৎপ্রেক্ষা।


কোথায় সে অরূপের স্বরূপ বন্দনা আজ?


যানজটের কঠিন ঘেরাটোপে ফুঁসছে নগর।
রাজনীতি তার মান মাপবার হারিয়েছে বাটখারা,
রাজসতীনের দ্রোহে-অপদ্রোহে নাকাল নাগরিকত্ব,
তাড়া খেয়ে পাড়াছাড়া নিরপেক্ষতার সুশীল অভিভাবক,
শিশুদের মাঠ খেয়ে, গরিবের হাট খেয়ে,
কবিতার পাঠ খেয়ে
    গজ গজ করে সব বিপণী বিতান!


কোথায় কবিতামেলা হবে সংস্কৃতির বিশুদ্ধ উৎসব?
তথ্যে-গবেষণায়-মৃন্ময় বক্তৃতায়
ভাষার বিকাশ তবে
    সাইনবোর্ড, নিয়ন বিজ্ঞাপনে
    বানানের ভুলে ভরা উৎসব।
ভুল উচ্চারণে মুখর রাজনীতির মুখপাত্র,
অবিরাম পলিটিক্যাল ইভটিজিং,
  তেল অটিস্টিক পলিটিক্স সঙ্গে সাড়াঁশি সমন
অশালীন আক্রমণ, কবিতা না বোঝা মন
কবিতায় ফের উচাটন!


না মাটি না ইট,
মেঠোপথ খেয়ে ফেলা বিমূর্ত উন্নয়ন
পল্লীকবির সবুজ সংসারে মোটর বাইকের ঘোড়দৌঁড়
কালো চোখ, কালো ধোঁয়া, হিংস্রতা, দোররা তাবিজ তুকতাক
এবড়ো থেবড়ো মফস্বল, ডাহুকের গ্রাম ছেড়ে যেন আজ
পেটমরা সমগ্র গ্রামীণ মুখবায়ব শহরমুখো,
নদীভাঙা কাদামাখা অনভিজ্ঞ কোটি কোটি পা
শহরের পাথর ঘঁষছে, বাহনের প্যাডেল, বাসের ভীড়,
গার্মেন্টস গৃহমুখী পিঁপড়ের সারি, বস্তির বাহুল্য,
বিদ্যুৎ বাহার, গ্যাসের টানাপোড়েন, নেশার নাচন
ক্রমে ক্রমে নগর দখল!


বাঘে-মোষে বাঁচে এক সমাজের অথর্ব খাঁচায়
একই ঘোলা জলে তৃষ্ণা মেটায়, সাঁতরায়, কাৎরায়।
    দুর্জন উবাচে আজ সমাজ সংহার
    প্লেটে প্লেটে হাসে দুর্নীতির উপাচার!



কবিতার পাঠশালা আজ দাঁড়াবে কোথায়?
অন্তঃমিল থাক বা না থাক,
কবিতায় ছন্দ থাকে,
স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্ত থাকে,
একটি কাঠামো থাকে,
কাব্যের নির্মাণ নিয়ে কাঠামো জানেন যারা,
তাদের নিগূঢ় হাতে মাঝে মাঝে
    খেলা করে মুক্ত ছন্দ,
নিয়মের ভিতরে আবার নিয়ম ভাঙার সারাৎসার।


কবিরা জ্যোতিষ নয়,
তবে বোধগম্যে খেলা জানে আলো ও আঁধার!


আগামীর আলোবাতি নিয়ে
সল্তে জ্বালানো সেই
ট্রেডেল মেশিনে ছাপা লাল লিফলেট
স্ক্যান করা ইশতেহার আজও দৃশ্যমান!
আজও অপেক্ষমান এক ব্যথাতুর আকুলতা,
এতো যে কবিতা কথা, উৎসব, প্রতিশ্রুতি
    অথচ নিখাদ নিরপেক্ষতায় একটি জাতীয়
    কবিতা ভবন আজতক দাঁড়ালো না!


নদী-গর্ভেও বিলাপ ; জল হারানোর ইতিহাসে
কবিতা হয়তো আছে তবে
কবি-মাতৃকতার উচ্ছ্বাসে, ব্যাকরণে
ছন্দ-সুকোমল-সুদৃশ্য-বিন্যস্ত-বিনিসুতো বিকিরণে
সাজেনি সমাজ,
বরং সেজেছে এক কবিতা খাদক, সুশ্রী প্রতিমার হন্তারক।


যুগ চলে যায়, বয়েস পালায়,
প্রতিজ্ঞা লুকিয়ে আছে কোন অজানায়
ট্রেডেল মেশিনে ছাপা লাল লিফলেট
অগ্নিগর্ভে  আকুতি জানায়, হৃদয় সানায়।


লাল লিফলেটে কাঁদে পুলিশ তাড়ানো স্মৃতি,
হ্যান্ড কম্পোজের গ্যালি, মধ্যরাতে এক প্রেস থেকে
আরেক প্রেসের গলগ্রহ, অক্ষর বিদ্রোহ গাঁথা
নতুন আহ্বান চাই গণতন্ত্র, চাই কলম-কণ্ঠের মুক্তি,
বিপন্ন স্বদেশ হোক সমূলে কাব্যনগর!


কবিতা কলার প্রতিশ্রুতি প্রস্রবণে
হয়তো তারুণ্য পেলে
আবার উঠবে ফুঁসে ব্যর্থ জমানায়
সোমত্ত বিদ্রোহ রূপ কানায় কানায়।
ফের সেই বন্দিত শ্লোগান: তোমার আমার অধিকার
দিব্যলোকের ভোটাধিকার, নিরপেক্ষ ব্যালটাধিকার,
বছর বছর গণতন্ত্র ক্ষমতাকে দাব্ড়ানোর পর
ওহে ক্ষমতাধিকারী, পরওয়ারদিগার
অন্তত একটি সানন্দ দিবস তুলে দাও
আমরা ফোটাতে চাই ভোট-কবিতায় নিশিগন্ধাধিকার

প্রফুল্ল প্রাণজ বীজ-চারা ফল-ফুল-সুখতন্ত্র,
চোখের দৌরাত্ম শেষে মনের চৌকাঠে ধরা দিক সোমত্ত সুদিনাধিকার।

লাল অক্ষরের লালে লাল ধারাপাত
প্রযুক্তি প্রধান যুগেও আজ মননে-মগজে স্মৃতিপাত, অগ্নিপাত।
কালি-কলম কবিতা পাশে আবার প্রতিজ্ঞাময়
ট্রেডেল মেশিনে ছাপা সেই লিফলেট,
শব্দকর্মীদের  দিলখুশ স্বাধিকার,
শিল্পীকর্মীদের, হিতবাক্য বাচিকের বার্ণিক কণ্ঠাধিকার,
অগ্নিগর্ভে অদিতি-আকুতি আজ পদ্যগ্রাম,
            বিশ্বায়নে দেশাচার
মাথা থেকে নেমে যাও স্বৈরাচার, ব্যাভিচার, নিত্যকার রাজাকার,
অন্যের আলোয় জ্বলা ক্ষমতার অন্ধকার!

শৃঙ্খল মুক্তির গানে আজ মেতেছি মাতম।
ডাকে রাশি রাশি কবিতা রাশির জাতকেরা,
ডাকে দধ্যুন্ন সমাজ, বান্দা জনগণ,
ডাকে লাল লিফলেট, ডাকে ট্রেডেল মেশিন
ডাকে স্মৃতিজট: খটাং খটের খট, খটাং খটের খট
     খটাং খটের খট
ডাকে মেশিনম্যানের শ্বাস, কালি-কাগজের ঘ্রাণ,
স্বাধীনতা ডেকে আনা; গণতন্ত্র হাতানোর মুদ্রণ ইতিহাস...
ডাকে সত্যের চকমিলান সিঁড়িঘর,
ডাকে সেই অনন্ত ইশতেহার
আবাস-প্রবাস দেশ-মাতৃকার কল্যাণ-কৃপার সেই
সূর্যকরোজ্জ্বল কবিতাধিকার,
মহাবিশ্ববাতায়নে প্রথম দাবির নাম: কবিতাধিকার। কবিতাধিকার।

বিশুদ্ধ পদাবলীতে সিদ্ধ স্বাধিকার, প্রাধিকার
যে সুরে অসুর কাঁদে, বুকভেজা ঐতিহ্য সংগীত শত রাধিকার,
                               কোটি রাধিকার।

ফিরে এসো লাল লিফলেটদিন, দেয়াল পোস্টার,
ফেসবুক-ব্লগে-টুইটারে অধুনা উন্মাদনায়
যদিও চেয়েছি চিদাকাশ, প্রিয়তন্ত্র, আবসান ক্রনিক ভ্রান্তিকতার,
দেখো আজ তাবৎ প্রশান্ত কানে বিষুৎসব যান্ত্রিকতার।
পরাস্ত-প্রলাপ আর নয়, পীড়নে মস্তক নয় হেড
ট্রেডেল মেশিনে ছাপা লাল লিফলেট দেখো
দুর্মর দুশ্চর আর
    এখনও তোমার আছি গদ্যে-পদ্যে-বর্ণে
    কবিতার লাল কমরেড,
    কবিতার লাল কমরেড...