Print

সামান্থা স্মিথের জন্যে খোলা চিঠি (পটভূমি)

সামান্থা রীড স্মিথ। একজন মার্কিন কিশোরী। পরিচিতি পেয়েছিলো সামান্থা স্মিথ নামে। জন্ম ২৯ জুন, ১৯৭২। ঘটিয়েছিলো এক বিস্ময়কর ঘটনা! সালটি ছিলো ১৯৮২। তখন বড়ো দেশগুলোতে চলছে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি। হুমকির মুখে চলে যায় বিশ্বশান্তি। সে সময় সামান্থা একটি চিঠি লিখলো। লেখাটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান ইউরি আন্দ্রপভের নিকট। সম্মিলিত রাশিয়া তখন এক সুবিশাল দেশ। পারমাণবিক অস্ত্রের কারখানা বানিয়েছে। গবেষণা ও প্রস্তুতি চালাচ্ছে সমানে। ১০ বছর বয়সী সামান্থা প্রেসিডেন্ট আন্দ্রপভকে লিখলোÑ পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে হবে। বোমামুক্ত বিশ্ব উপহার দিতে হবে আগামী দিনগুলোকে। আমরা নতুন প্রজন্মÑ যুদ্ধমুক্ত নতুন পৃথিবী চাই।
প্রেসিডেন্ট আন্দ্রপভ এ চিঠি পেয়ে চমকিত হলেন! ভীষণ ব্যস্ততা, তারপরও জবাব দিলেন। রাশিয়ায় আমন্ত্রণ জানালেন সামান্থাকে। এসে দেখতে বললেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার দেশে অনেক ভালো কর্মসূচিও রয়েছে। বিষয়টি মার্কিন সরকারও গুরুত্বের সাথে নিলো। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে সামান্থাকে পাঠিয়ে দিলো রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে।
কিন্তু আন্দ্রপভের সাথে সাক্ষাত হয়নি সেই শান্তিকন্যার। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সামান্থার ভ্রমণ বেশ আলোড়ন তোলে। বিশ্ববাসী তাকে ‘শান্তির দূত’ নামে ডাকতে থাকে। সামান্থাও দেশে ফিরে এসে শুরু করে আরো নতুন নতুন কাজ। ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’Ñ এই শ্লে¬াগানের ওপর একটি ছবি তৈরি হচ্ছিলো। সামান্থা তাতে অভিনয় করছিলো মূল ভূমিকায়। কিন্তু শেষ করতে পারলো না! শ্যুটিং করতে যেতে হচ্ছিলো গ্রামে। বাবা আর্থার স্মিথসহ রওনা দিলো হেলিকপ্টারে। কিন্তু মাঝ পথেই রহস্যময় দুর্ঘটনা! সাতজন আরোহীসহ পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেলো শান্তিকন্যা সামান্থা স্মিথ! কালো সেই তারিখটি ছিলো ২৫ আগস্ট, ১৯৮৫। এরপর সারা বিশ্বেই তোলপাড়, শোকের মাতম!
এ মাতম নিয়ে বাংলাদেশে অনেক লেখালেখি হয়। তারুণ্যের আলোড়নে আমিও নির্মাণ করি একটি সহজ কবিতা। শিরোনাম: ‘সামান্থা স্মিথের জন্যে খোলা চিঠি’। ছাপা হয় দৈনিক সংবাদ-এ। পাঠকও আলোড়িত হন। এ কবিতাটির জন্যে আমি জাতীয় যুব ইউনিয়ন পুরস্কার ’৮৫ পেয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল টিএসসি বা ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে সমাদৃত হলাম। তৃতীয় জাতীয় সম্মেলনে যুব ইউনিয়ন নেতৃবর্গ পুরস্কার তুলে দিলেন। সম্মাননা গ্রহণকালে দর্শকদের দাবি মতে তুলে দিতে হলো স্বকণ্ঠ আবৃত্তি। মানবাধিকার, বিশ্বশান্তিসহ যুক্তিহীন যুদ্ধের বিরুদ্ধে অনেক লিখেছি। এখনও লেখার ট্রেন ধাবমান। তবে এটি বিশিষ্টতা পেয়েছে নানা কারণে। প্রধানত কবিতাটির সহজ ভাষা সব বয়েসের পাঠককে একযোগে আলোড়িত করতে পারে।
আরেকটি বিশাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই কবিতাটির। গবেষকদের মতে, এটি বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ কিশোর গদ্য কবিতা। অক্ষরবৃত্ত নামের প্রচলিত ছন্দের কাঠামো থাকলেও অন্তঃমিল, প্রান্তমিল নেই। সুর করে পুঁথি জাতীয় পাঠের ব্যবস্থাও নেই। তবে গদ্য কবিতা হিসেবে আবৃত্তিকার বা বাচিক শিল্পীরা এই পদ্যটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। পৃথিবীর বহু মঞ্চে, অসংখ্য আয়োজনে এটি পাঠিত হয়েছে। সংকলিত হয়েছে নানাবিধ প্রকাশনায়। অনুদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। শান্তির সপক্ষে যুদ্ধবিরোধী আয়োজনে কবিতাটি বিশেষ সমাদর পেয়েই চলেেেছ। যদিও পৃথিবীতে যুদ্ধ চলছেই। হত্যাযজ্ঞের করুণ ক্রন্দন থামানো যায়নি। মিডিয়ায় রক্তমাখা লাশের ছবি থামছে না। শিশু-কিশোর-কিশোরীরা অস্ত্রের শিকার হচ্ছে বেশি। আণবিক, পারমাণবিক, পাশবিক যুদ্ধ থামানোর আকুলতা আজও বিশ্বব্যাপী। মার্কিন শান্তিকন্যা সামান্থার আবেদন যেন চলমান প্রেক্ষাপটে নিহত গোলাপ হয়ে উঠছে। তারপরও, বিশ্বশান্তির জন্যে দিয়ে চলেছে নীরব তাগাদা। আমি প্রায়শ সেই ডাক শুনতে পাই। স্মৃতিতে সদা ভাস্বর সেই বেদনাহত কবিতাটিÑ সামান্থা স্মিথের জন্যে খোলা চিঠি...!