দোকান আমাকে কেনো
ভোরের টাটকা আলো ভেবে দোকানের পুষ্টি সব্জি
অনেক কিনেছি। সূর্যাস্ত তার সবটুকু খেয়ে চেটেপুটে
যাবার বেলায় বলে গেছে, কাল আবার বাজারে যেও।
এভাবেই পরিবার, ক্রয়কারী গুচ্ছচোখ
প্রতিদিন দোকানকে কেনে। সোনার হরিণ কেনে,
অলংকার, জাপানি পুতুল, বৃটেনের বুকযন্ত্র কেনে,
কোলবালিশের কষ্ট নিয়ে আমি এক বিলম্যান
প্রতিদিন ক্রোধ কিনি,
শুধু প্রতিরোধ কিনতে পারি না।
আমি গোলাহীন গৃহী, পরিবার ভালোবাসি।
গৃহের পরিজনেরা দেখি ভালোবাসে ক্রয়ের উৎসব।
আমি খুঁজি প্রেমজ কুসুম।
কুসুমেরা আজকাল শপিংয়ের ইনকুবেটর ছাড়া
থ্রি-পিস উত্তাপ, আংটি দ্যোতনা বা নেকলেস ছোঁয়া ছাড়া
ঠোঁটেমুখে ফোটেনা, আবার
কিংচিকেনের সাথে দশহরা ফ্রুটজুস না হলেই
নবজন্মের খাতিরে সৌম্য খোঁপাও খোলে না।
আমি খুলি আমার সঞ্চয়,
সবখানে শুধু দেখি দোকানের আদিগন্ত জয়।
বৃদ্ধ বাবার দু’চোখ চশমাপ্রবণ তবু
লাঠিভর মায়ের হৃদয়সহ তিনিও খোঁজেন
ছাতা-লাঠি-শীতচাদর-জায়নামাজ দোলায়িত দরাদরি।
উৎসবে মাতাল দোকান; জনগণ আগ্রহী আসামী।
দোকান সর্বস্ব সেই বেসাতি জীবন
আমাদের কর্মিষ্ঠ দিনকে বানালো ক্রয়ের ক্রীতদাস।
বিষাক্ত রঙের জোরে গর্দভ পটল, সীম, সব্জি, শাক
যন্ত্রসবুজ মটরশুটি, হাবাগোবা আলু, পেঁপে, ধনে পাতা
রংবাজ শশা, কাঁচা কলা, সারের সুন্দরী লাউ, লেবু
বীরাঙ্গনা বেঢপ বেগানা বেগুন, কাকরোল, ইঁচড়েপাকা ঢেঁড়শ
র্যাগ ডে‘র রঙে রাঙা ইলিশের চোখ,
সন্ত্রাসী পাঙ্গাস, আলতা মাখানো রুই, সরপুঁটি
হলুদে উজ্জ্বল কাতলার কানকাসা,
লিপিস্টিক রূপের হাসিতে রূপচাঁদাদেহ,
হিজড়ার সাজে দেখো শোলমাছ স্বাদহীন ঝোলের আদলে
উঠে আসে খাবার টেবিলে, ছড়াতে বিস্বাদ।
বহুমুখী মাছের ফণায় ভর্তি বাজারের থলে।
জল্লাদ কসাই দেবে বহুমুখী মাংসের উইডিবি থোক!
মিষ্টান্ন ভান্ডারে দেখো চিনির পাহারাদার,
দুধের দমন।
ছানাকে সামাল দিতে ময়দার মার্চপাস্ট।
ভেজালের ভাগ্যচক্রে আজ মনে হয় সকল পরিবারের
নিজস্ব খামার নেশা, স্বনির্ভর গাভী ও ট্রাক্টর
বিশুদ্ধ তেলের ঘানি, পরিশুদ্ধ পানির প্রবাহ
একান্ত আরাধ্য দাবি।
সৃষ্টির উদ্যমে গড়া কাঁচামিঠে কবিতা যেমন
সেভাবেই উৎপাদনের আলোয় ধরি সদ্যজাত পণ্য।
মায়ের দুধের চেয়ে দোকানের গুড়োপণ্যে
জীবনের নিরানব্বই শতাংশ ঝুলে আছে,
মাংস এবং নেট সুতোয় ফুটবল ঝুলে থাকে,
বহনের দোকান-ঝুলন্ত বাসে বাসে
বিস্কুট দৌঁড়ের সুতো ঝোলে হাতবাঁধা
লম্ফঝম্ফের চোখে মুখে,
কোটি টাকার প্রত্যাশা পোস্টার-ফেস্টুন ঝুলে
লটারির সুযোগ্য দোকানে,
সুদৃশ্য এ্যাপার্টমেন্টে ঝুলে থাকে নর্তকী শপিংমল,
ক্যাপসুল লিফটের নগ্নতায় ঝোলে
বহুরঙা কামজ ক্রেতার ঢল,
দেখো, জনসভা-সাহিত্য-নাটক-লাইব্রেরি-পুঁথিপাঠ
সবটা ছাপিয়ে ঝর্ণাজলে ঝোলে লোভের কালার।
ক্রয়ের ক্রেজের পাশে পণ্যশালার সোমত্ত শ্যালিকারা
শপিং এক্সপার্ট সব অতি সংসারী বুজরকি রমণীরা
পসারীর হাটুরে নারীরা, পণ্যাঙ্গনাদের দেহচোখে
এতো দিকচক্রবাল, এতো পণ্যবীথি সমাহার।
এতো দোকান বিপ্লব
পায়ে পায়ে পণ্যের প্রসবডালা,
এতো প্রদর্শনী, এতো বিক্রয়বাসর মেলা
চোখে রক্ত ওঠা কানফাটা বজ্র বিজ্ঞাপন,
কাগজের অসভ্য দখল
আমাকে বাঁচাও জাতিসংঘ,
প্রচার-প্রধান এই বিপণন গ্রামে
আমি আজ ক্রয়ের ক্লান্তিতে মরি!
আমার পকেট-পুঁজি নিমখুন,
আমাকে বাজারমুক্ত করো।
কনজিউমার রাইটের ধ্বজা ধরে কোনো তেজিমন্দি
বা কোনোই মূল্যহ্রাসের দাবিতে নেই,
ক্রেতার চাবিটি বরং তুলে দিতে চাই বিত্ত-বিপণিতে,
এবার দু‘চোখ বন্ধ করে
আমাকে কিনুন পণ্য পত্তনের সুরম্য অধ্যক্ষ।
আমি বিপণি-বিহার রমণীদের লাল জিহ্বায়
বড়শি ফেলবো বাক্যবন্ধের ছিপসুতোয়।
সংলাপমুখর সব সেলসম্যান ওম্যানের পাশে
পোয়েটম্যান বা পোয়েট-ওম্যানের দখল
একযোগে সারা পৃথিবীর সকল দোকানে যদি
কবিরা দখল দেয় শব্দ-মহার্ঘ বিক্রির,
এতো টাট্কা বাক্য-কামদার, গীতল শীতল পাটি,
এতো বাক্সময় পদ্যাচরণ, এতো কবিতাকথক,
এতো সানবাঁধা ভাষার বিস্তার, বিক্রি
সকল গ্রাহক মন একযোগে কবিতাপ্রবণ।
একযোগে কালিদাস, খনার বচন,
একযোগে জয়নাদ
বিবাদের কানে কানে কবিতা শ্রবণ।